কালীগঞ্জে বেসরকারী হাসপাতাল গুলিতে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ

মুঃ সোহরাব আলী সরকার, কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধিঃ// কালীগঞ্জে লাইসেন্স নবায়ন ছাড়া ও পরিবেশগত ছাড়পত্র দিয়েই চলছে অধিকাংশ বেসরকারী ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তাদের বিরুদ্ধে বিগত সময়ে চিকিৎসা সেবায় অবহেলা, বিভিন্ন পরিক্ষা-নিরীক্ষার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও ভূল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর ঘটনাসহ নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে নিবন্ধিত ২১টি প্রতিষ্ঠানের মাঝে মাত্র চারটির লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ২১ টি বেসরকারী ক্লিনিক ও হাসপাতাল রয়েছে। তবে, এসব ক্লিনিক-হাসপাতালের বৈধ লাইসেন্স, চিকিৎসাসেবার মান, চিকিৎসকের উপস্থিতি, রোগীর নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগের তদারকিতে ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে অস্ত্রোপচার, প্রসূতিসেবা, জরুরি চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং যথাযথ অনুমোদন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তারা।
উল্লেখ যে, ২০২৫ সালের ১২ মাচ মার্চে উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নে অনুমোদন সংক্রান্ত নথি দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় ‘জরিনা ক্লিনিক’ কে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাসহ সিলগালা করা হয়। মোবাইল কোর্ট চলাকালে অপারেশন থিয়েটারে যথাযত যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারায় অতিসম্প্রতি জামালপুর বাসাইর বাজারে নুবহা জেনারেল হাসপাতালকে ৫০ হাজার টাকা ও কালীগঞ্জ ডায়াগনষ্টিক হাসপাতালের প্যাথলজি ল্যাবে মেয়াদোত্তীর্ণ রিএজেন্ট পাওয়ায় ২০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হয়েছে।
সরকারী হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারী ক্লিনিক, হাসপাতালে সেবা গ্রহণ করেন বহু মানুষ। এসব প্রতিষ্ঠানে রোগীদের চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকে। তবে প্রশ্ন রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের বৈধতা, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের উপস্থিতি, চিকিৎসা সেবার মান এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা তদারকি করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গাজীপুর সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্সের মেয়াদ দুই বছর মেয়াদী করার কথা ছিল। বিভিন্ন জটিলতায় তা বাস্তবায়িত হয়নি। একই সঙ্গে নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ প্রযোজ্য শর্ত পূরণের নির্দেশনা রয়েছে।
বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সেবা প্রার্থী বলেন, কোনো বেসরকারী হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, জরুরী ব্যবস্থাপনা, অনুমোদিত শয্যাসংখ্যা, অস্ত্রোপচারের অনুমতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে কি না কর্তৃপক্ষের তা নিয়মিত যাচাই করা জরুরী। একই সঙ্গে রোগীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি নেওয়া হচ্ছে কি না, পরীক্ষার ফলাফল কতটা নির্ভরযোগ্য। তা যাচাই ও তদারকি করা প্রশাসনের কর্তব্য। প্রসূতি ও নবজাতকের চিকিৎসাসেবায় বিশেষ সতর্কতা দরকার। জররী পরিস্থিতিতে রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর প্রয়োজন হলে দ্রুত ও নিরাপদ স্থানান্তরের ব্যবস্থা থাকা জরুরী।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, কালীগঞ্জ উপজেলায় বর্তমানে কতটি বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালু রয়েছে, এর মধ্যে কতটির বৈধ লাইসেন্স রয়েছে, কতটি লাইসেন্স নবায়ন করেছে, কতটির নবায়ন করা হয়নি এবং কতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে এসব তথ্য সংগ্রহের পর্যাপ্ত ঘাটতি রয়েছে।
সুশিল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। স্বাস্থ্য সেবাকে ব্যবসার ঊর্ধ্বে রেখে রোগীর জীবন ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। বৈধ অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান যাতে পরিচালিত হতে না পরে সেদিকে গুরুত্ব দেয়া দরকার। জনগণের প্রত্যাশা নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পূরণে বেসরকারী স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি এবং স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরী।
লাইসেন্স নবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডাক্তার মো. মামুনুর রহমান মুঠোফোনে প্রতিবেদককে বলেন, নবায়নের জন্য বেশকিছু আবেদন জমা হয়েছে। কাগজপত্রে জটিলতা থাকায় লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় প্রশাসনসহ ইউএইচএফপিও কে বলব এসকল বিষয়ে তদারকি বাড়াতে। খুব শীগ্রই বেসরকারী ক্লিনিক, হাসাপাতাল পরিদর্শনে যাব এবং আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করব।
