শেরপুরে দিনে ১০-১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীনতায় বিপর্যস্ত জনজীবন,কৃষি খাত
জুবায়ের আহমেদ রাসেল : গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শেরপুর জেলায় তীব্র লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। দিনে ৮ থেকে ১০ বার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করছে, কোথাও আধা ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরবর্তী ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা থাকে না। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ভ্যাপসা গরমে নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে জেলার বাসিন্দাদের।
ঝিনাইগাতী উপজেলার যোগাকুড়া গ্রামের বাসিন্দা নবর আলী বিরক্তিভরা কণ্ঠে বলেন, গত কয়েকদিন ধরে তীব্র লোডশেডিং হচ্ছে। দিনে ৮-১০ বার বিদ্যুৎ যায়। আধা ঘণ্টা থাকলে তিন-চার ঘণ্টা থাকে না। রাতে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। গরমে ঘুমানো যায় না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের এলাকায় সাবমার্সিবল মোটর ছাড়া পানি তোলা খুব কষ্টকর। তাই নদী থেকে স্যালো মেশিন দিয়ে পানি তুলতে হয়। কিন্তু এখন তেলেরও সংকট। কারেন্ট না থাকায় ভাড়ায় মোটর চালিয়ে কোনোভাবে সেচ দিতে হচ্ছে। আমরা খুব খারাপ অবস্থায় আছি।
শুধু নবর আলী নন, জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। একদিকে তীব্র দাবদাহ, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। গ্রামীণ এলাকায় দিনে-রাতে গড়ে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টারও বেশি লোডশেডিং হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। এর মধ্যে চলছে এসএসসি পরীক্ষা, ফলে শিক্ষার্থীরাও পড়েছেন চরম বিপাকে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) শেরপুর সূত্রে জানা যায়, জেলায় পিডিবির মোট গ্রাহক প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার। বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৪২ মেগাওয়াট, তবে গত তিন-চার দিন ধরে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ মেগাওয়াট। এতে প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। কিছুদিন আগে সরবরাহ আরও কম ছিল বলে জানা গেছে। পিডিবির আওতায় জেলায় প্রায় ৫ হাজার সেচ সংযোগ এবং ৯০টি শিল্প সংযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, শেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলার পাঁচটি উপজেলায় পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার। এ খাতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। জেলায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অধীনে কৃষি সেচ সংযোগ রয়েছে ১০ হাজার ৮৭৯টি।
স্থানীয়রা জানান, ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রামাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। শিশু ও বৃদ্ধদের পাশাপাশি এসএসসি পরীক্ষার্থীরাও সমস্যায় পড়েছেন। ইরি ধানে সঠিকভাবে সেচ দিতে না পারায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি পোল্ট্রি খামারিরাও বিপাকে পড়েছেন।
এছাড়া শেরপুরের তিনটি পাহাড়ি উপজেলায় পরিস্থিতি আরও নাজুক। পাহাড়ি এলাকা ও গাছপালায় ঘেরা অঞ্চলে সামান্য ঝড়ো বাতাস হলেই ২০ থেকে ৩০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না, যা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
শ্রীবরদী উপজেলার কাকিলাকুড়া গ্রামের কৃষক মিজান উদ্দিন বলেন, আগে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভালো ছিল। এখন দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। রাতে ১১টার পর এক-দুই ঘণ্টা থাকে, তারপর আবার নেই। এতে ইরি ধানের সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এসএসসি পরীক্ষার্থী আলতাফ হোসেন বলেন, দিনে-রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পড়াশোনা করতে পারছি না। গরমে বসে থাকা কষ্টকর হয়ে যায়।
নালিতাবাড়ী উপজেলার ব্যবসায়ী আরমান মিয়া বলেন, লোডশেডিং এত বেশি যে আইপিএসের চার্জও শেষ হয়ে যায়। দোকান অন্ধকার হয়ে যায়, গরমে ক্রেতারা বসতে চায় না। ফলে ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির শেরপুর জেলা শাখার জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. মাইনউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহ ওঠানামা করে। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ কম পাওয়ায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। আমরা চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ পাচ্ছি, যার কারণে দৈনিক প্রায় ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
এ বিষয়ে শেরপুর জেলা পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী সাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে জাতীয় গ্রিডে সমস্যার কারণে চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছিল। তবে গত তিন-চার দিন ধরে সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে, ফলে লোডশেডিং কিছুটা কমেছে। তারপরও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কৃষি উৎপাদন, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সাধারণ মানুষও দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।নির্বাহী প্রকৌশলী।



আপনার মতামত লিখুন