২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস তথ্য অধিকার (আরটিআই) আইন: নাগরিকত্ব উপলব্ধির এক শক্ত হাতিয়ার
নাগরিক জীবনের সুশৃঙ্খল প্রবাহে সুশাসনের বিকল্প নেই – কেবলমাত্র সুশাসনই সমাজে একজন ব্যক্তির যথাযথ ভূমিকা, দায়িত্ব, অধিকার এবং কর্তব্য নিশ্চিত করতে পারে। অতএব, সুশাসনের মৌলিক পূর্বশর্ত হিসেবে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার একটি অনন্য স্থান রয়েছে। কারণ সমাজে সাংবিধানিকভাবে অর্পিত ব্যক্তি যদি তা পালন না করেন, তাহলে সমাজের নিয়মতান্ত্রিক প্রবাহ ব্যাহত হয়, শৃঙ্খলা স্থবির হয়ে পড়ে। যেখানে শৃঙ্খলা নেই, সেখানে সংহতি থাকতে পারে না। সমাজে সংহতির উপস্থিতি ছাড়া মানুষের জীবন আর জীবন থাকে না, এটি হয়ে ওঠে কেবল বেঁচে থাকার জন্য। এই পরিস্থিতির সুষ্ঠু ও কার্যকর মোকাবেলার জন্য তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন প্রবর্তনের মাধ্যমে দেশের জনগণের তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করেছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ, যারা প্রান্তিক বা সুবিধাবঞ্চিত বলে পরিচিত, তারা তাদের ন্যায্য অধিকার উপভোগ করার জন্য তথ্য অধিকার (আরটিআই) আইনকে একটি অনন্য হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। এতে বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান (যারা এনজিও নামে পরিচিত) এই বিষয়ে তাদের উৎসাহিত করছে এবং সহায়তা দিচ্ছে। এখন আমি এমনই একটি অভিজ্ঞতা উপস্থাপন করতে চাই।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা সাতক্ষীরার সদর উপজেলার অত্যন্ত দরিদ্র আদিবাসী বাগদী সম্প্রদায়ের সাতজন নারী-পুরুষ (অঞ্জলি ম-ল, জয়ন্তী ম-ল, ভোলা ম-ল, বৃন্দাবন ম-ল, নমিতা ম-ল, শঙ্কর গোলদার এবং সান্তনা ম-ল) ঢাকাস্থ তথ্য কমিশনে অভিযোগের শুনানিতে অংশ নিতে এসেছিলেন। তাদের অভিযোগের বিষয় ছিল: ইতোপূর্বে তারা সাতক্ষীরা সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর কাছে পৃথকভাবে নি¤েœ উল্লিখিত তথ্য চেয়েছিলেন:
(১) ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ৮ নম্বর ধুলিহর ইউনিয়নে বসবাসকারী নৃগোষ্ঠীর কতজন শিক্ষার্থীকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কর্তৃক উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে; আমি নামের তালিকা এবং মাথাপিছু উপবৃত্তির পরিমাণ জানতে চাই;
(২) সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ৮ নম্বর ধুলিহর ইউনিয়নে বসবাসকারী নৃগোষ্ঠীর লোকজন, যাদের নামে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিনামূল্যে পায়ে চালিত ভ্যান সরবরাহ করা হয়েছে . তাদের নামের তালিকা পেতে চাই; এবং
(৩) পায়ে চালিত ভ্যান বিতরণের নীতিমালার মূল কপির একটি ফটোকপি পেতে চাই।
আবেদনের উত্তরের জন্য নির্ধারিত ২০ কার্যদিবসেরও বেশি সময় অপেক্ষা করার পরও কোনও উত্তর না পেয়ে তারা নীতিমালা অনুসারে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কাছে আপিল আবেদন করেন এবং নির্ধারিত ১৫ দিনের মধ্যে তাঁর কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে তারা তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য কমিশন তাদের শুনানিতে অংশগ্রহণের জন্য নোটিশ দেন।
দুপুর ১২.০০ টার দিকে অভিযুক্ত ইউএনও এবং অভিযোগকারীদের কমিশনের শুনানি কক্ষে ডাকা হয়। নির্ধারিত আসন গ্রহণের পর অভিযোগকারীরা শপথ পাঠ করে একে একে তাদের অভিযোগ উপস্থাপন করেন। অভিযোগগুলো উপস্থাপন করা হলে কমিশন অভিযুক্ত ইউএনওকে তার বক্তব্য উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। ইউএনও তার বক্তব্যের শুরুতেই বলেন যে তিনি তথ্যপ্রার্থীদের অফিসে ডেকে তাদের উত্তর দিয়েছেন এবং ছবিগুলোও তার কাছে আছে। কমিশন বলেন, ‘আপনি কোন আইনের অধীনে তাদের অফিসে ডেকেছেন? তারা লিখিতভাবে তথ্য চেয়েছেন, আপনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের ঠিকানায় লিখিত উত্তর পাঠাবেন; আপনি যে উত্তর দিয়েছেন তা কোন উত্তর নয়।’ এ সময় ইউএনওকে বেশ কিছু তিরস্কারও হজম করতে হয়। ইউএনও যখন এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন তখন কমিশন আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এরপর কমিশন জানতে চান, ‘আপনি এখন তাদের তথ্য কীভাবে দেবেন?’ জবাবে ইউএনও বলেন যে তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। এরপর কমিশন বলেন, ‘এটা বিবেচনা করা যাবে না, আপনি আগামী ৫ দিনের মধ্যে তাদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেবেন’। ইউএনও অতিরিক্ত ২ দিন সময় চাইলে কমিশন সম্মত হন এবং বলেন যে, যদি এই সময়ের মধ্যে সঠিক তথ্য সরবরাহ না করা হয়, তাহলে সমস্যা জটিল হয়ে উঠবে; গ্রামের মানুষ, তারা কম শিক্ষিত, ভয় পায়, তাই তারা স্পষ্ট করে বলতে পারেনি, নাহলে এটা এখনই সমস্যায় পরিণত হয়ে যেত।
শুনানির পর প্রধান তথ্য কমিশনার বেরিয়ে এসে অভিযোগকারীদের ডেকে বলেন, ‘তোমাদের কখনই ভয় পাওয়া উচিত নয়। তোমরা সবসময় তোমাদের অধিকার সম্পর্কে তথ্য চাইবে। যদি কোন অসুবিধা হয় তবে আমরা আছি।’ একজন তথ্য কমিশনার তাদের জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমাদের কি অন্য কোন সমস্যা আছে?’ উত্তরে তারা বলেন, ‘আমাদের জীবনই আমাদের সমস্যা। প্রশাসন সহ কেউ আমাদের জন্য কাজ করে না।’ জবাবে তথ্য কমিশনার বলেন, ‘আমরা তোমাদের জন্য আছি। সাহসের সাথে কাজ কর। আমি শীঘ্রই তোমাদের এলাকা পরিদর্শনে আসব।’ পরের দিন ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় এই খবর প্রকাশিত হয়, তখন এলাকায় বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
ঘটনাটি কয়েক বছর আগের। কিন্তু এর প্রভাব এখনও এই সম্প্রদায়কে অনুপ্রাণিত করছে। তথ্য কমিশনের শুনানির পর আসা অভিযোগকারীদের মুখে আনন্দের রেখা ফুটে ওঠে। মনে হয়েছিল এটি প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করার একটি স্মরণীয় মুহূর্ত- তারাই দেশের আসল মালিক। বলা বাহুল্য, এই সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা অবহেলিত জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছে। সম্প্রতি তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সরকারি পরিষেবা ইত্যাদিতে তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সামাজিক মূল্যায়নও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের নাগরিকত্ববোধ এবং সামাজিক সচেতনতা তাদের আলোর সন্ধান দিয়েছে।
বর্ণিত শুনানির কিছু শিক্ষণীয় দিক রয়েছে: প্রথম পক্ষ, অর্থাৎ তথ্যের জন্য আবেদনকারী বা অভিযোগকারী মানসিক শক্তি অর্জন করেছেন, যারা দেশের প্রকৃত মালিক। দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের প্রকৃত মূল্যায়ন আছে; যদি তারা চান, যেকোনো কর্তৃপক্ষ তথ্য প্রদান করতে বাধ্য। দ্বিতীয় পক্ষ, অর্থাৎ তথ্য প্রদানকারী বা সরকারি/আইনগত বেসরকারি খাতের মনোনীত কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছেন যে জনগণ আর ঘুমিয়ে নেই, তারা জেগে আছে। দেশের যেকোনো নাগরিককে তথ্য প্রদান না করার কোন সুযোগ নেই। তৃতীয় পক্ষ, অর্থাৎ বিচারক কর্তৃপক্ষ বা তথ্য কমিশনের সম্মানিত কর্মকর্তারা ব্যাখ্যা করেছেন যে, জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রে জনগণ যেকোনো বিষয়ে হিসাব চাইবে এবং তারা চাইলে তা এড়ানোর কোন উপায় নেই। জনগণকে উপেক্ষা করে বা এড়িয়ে কেউ পার পেতে পারে না, তথ্য কমিশন নাগরিকদের তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান।
যখন আমরা এই শুনানির সামগ্রিক সামাজিক প্রভাবের দিকে তাকাই, তখন তথ্যকর্মী হিসেবে আমরা অবশ্যই আশাবাদী হতে পারি:
• সরকারি অফিস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভীতি অপসারণের পথ উন্মুক্ত হয়েছে
• সাধারণ জনগণকে অবহেলা না করে ন্যায্য মূল্যায়নের একটি সরকারী সংস্কৃতি প্রবর্তনের পথ উন্মুক্ত হয়েছে
• মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল এবং ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য হ্রাস পাবে
• যদি একজন ব্যক্তি তার সাংবিধানিক এবং ন্যায্য অধিকার সম্পর্কে সোচ্চার হন, তাহলে রাষ্ট্রযন্ত্র সহ অনেক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের সমর্থন পাওয়া সম্ভব
• সকলেই আইনকে সালাম জানায় – শ্রদ্ধার সাথে হোক বা ভয়ের সাথে হোক
• স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার জন্য ত্রিপক্ষীয় (আবেদনকারী, তথ্য সরবরাহকারী এবং মীমাংসাকারী) আলোচনার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে
• তথ্যের জন্য অনুরোধ করা কেবল অধিকার প্রয়োগের বিষয় নয়, বরং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে একটি দায়িত্বও
• একটি যুক্তিসঙ্গত এবং অধিকার-ভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থা গঠনের পথ উন্মুক্ত হচ্ছে।
পরিশেষে বলতে চাই, আদিবাসী, উপজাতি, বাগদী, অনগ্রসর, অবহেলিত, নৃগোষ্ঠী, দরিদ্র ইত্যাদি নাম এবং পদবি ব্যবহার না করে অভিযোগকারীদের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মালিক বলাই আমাদের জন্য বেশি স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়। তারা আসলে দেশের মালিক সকল নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব করলেন; তারা একই সাথে তাদের অধিকার অনুশীলন করে গেলেন এবং দেশের মালিক হিসেবে তাদের দায়িত্ব পালন করলেন। দেশের সর্বত্র এই আইন অনুশীলনের যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক।



আপনার মতামত লিখুন