পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সাথে (৩০ আগস্ট) ইউসেপ বাংলাদেশ হলরুম, পবা রাজশাহীতে জেলা পর্যায়ে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশ সংরক্ষণে করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে রাজশাহীতে জেলা পর্যায়ে একটি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নেটজ বাংলাদেশ-এর আর্থিক সহযোগিতায় এবং ডাসকো ফাউন্ডেশন বাস্তবায়িত জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠির অধিকার সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে (এনগেজ)” প্রকল্পের আওতায় এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর জনাব মোঃ কবীর হোসেন। রাজশাহী জেলা এবং তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন সুশীল সমাজ সংগঠনের সদস্য, সাংবাদিক এবং পরিবেশবাদী কনটেন্ট ক্রিয়েটররা সংলাপে অংশগ্রহণ করেন।
সংলাপে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পরিবেশ সুরক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় চলমান ও পরিকল্পিত বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের অবহিত করা হয়।
আলোচনায় রাজশাহী জেলার বিভিন্ন এলাকার পরিবেশগত সমস্যা ও জনগণের অভিজ্ঞতা উঠে আসে। অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেন, বারণই নদীতে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ও শিল্পকারখানার বর্জ্য ফেলার কারণে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে, দুগন্ধ সৃষ্টি হচ্ছে এবং মাছসহ জলজ সম্পদ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় মানুষের জীবন যাপন ব্যাহত হচ্ছে।
তানোর এলাকার বিভিন্ন পোল্ট্রি ফার্ম, কোল্ড ষ্টোরেজ ও সংশ্লিষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে সৃষ্ট দুগর্ন্ধের বিষয়ও সংলাপে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়।
বক্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এসব দুগর্ন্ধের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল ও বসবাসে অসুবিধা হচ্ছে।
পরিবেশবাদী কনটেন্ট ক্রিয়েটররা রাজশাহী জেলার বিভিন্ন এলাকায় ইটভাটার অবস্থান, পরিবেশগত নিয়মকানুনের বাস্তবায়ন এবং জনবসতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিকটবর্তী ইটভাটার কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
গোদাগাড়ী উপজেলার রিশিকুল ইউনিয়নের কয়েকটি পোল্ট্রি ফার্র্ম থেকে সৃষ্ট দুর্গফের বিষয়ও আলোচনায় আসে। সদস্য বলেন, এ ধরনের দূষণের জন্য সাধারণ মানুষ দায়ী না হলেও তারাই এর প্রধান ভুক্তভোগী। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরদারি, অভিযোগ গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয়
আইনগত পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি জানতে চান।
এছাড়া প্রাণ কোম্পানির বর্জ্য আশপাশের জমি দিয়ে বৃষ্টির পানির সাথে ব্যক্তি মালিকানধিন পুকুরে জমা হয়, ময়লা পানির কারণে মশার উপদ্রব বৃদ্ধি এবং দুন্ধ সৃষ্টি হওয়ার বিষয়ও তুলে ধরা হয়। একইভাবে চান্দুরিয়া ইউনিয়নের অবস্থিত ০২ টি হাটের পাশে পোল্ট্রি ফার্মের বর্জ্যের কারণে বাজার এলাকায় দুর্গফ সৃষ্টি ও জনভোগান্তির কথাও অংশগ্রহণকারীরা উল্লেখ করেন।
সংলাপে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়েও আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, অনেক সময় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গাছ লাগানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে; পরবর্তীতে সেগুলোর পরিচর্যা, সংরক্ষণ ও তদারকি যথাযথভাবে করা হয় না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহয়ান জানানো হয়।
আলোচনায় কৃষিজমির টপ সয়েল অপসারণ ও বিক্রি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তারা উল্লেখ করেন, টপ সয়েলের উর্বরতা তৈরিতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হলেও বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষিজমি বা আবাসিক এলাকার আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে শিল্পকারখানা স্থাপনের ফলে পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ছে বলেও মত দেওয়া হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোঃ কবীর হোসেন অংশগ্রহণকারীদের উত্থাপিত পরিবেশগত সমস্যাগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনার আশ্বাস দেন। তিনি পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে চলমান কার্যক্রম এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, পরিবেশগত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী পরিদর্শন, মনিটরিং ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের হট লাইন নম্বর ৩৩৩৪ সর্ম্পকে অবহিত করেন।
সংলাপের শেষ পর্বে স্থানীয় পরিবেশগত সমস্যা চিহ্নিতকরণ, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বৃক্ষরোপণ ও বৃক্ষের পরিচর্যা নিশ্চিতকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ভবিষ্যৎ যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে মতামত ও সুপারিশ উঠে আসে।
আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের সংলাপের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পথ আরও সুগম হবে।

গোলাম রাব্বানী
প্রকাশের সময়: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬ । ৮:০৯ অপরাহ্ণ