কেউ এসেছেন খাসি পুঞ্জি থেকে, কেউ গারো সম্প্রদায় থেকে, কেউ ত্রিপুরা কিংবা চা-বাগানের শ্রমিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হয়ে। পরনে ছিল নিজ নিজ জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক। কারও হাতে দাবি সংবলিত ফেস্টুন, কারও কণ্ঠে নিজেদের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার প্রত্যয়। নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষের এমন বৈচিত্র্যময় উপস্থিতিতে রোববার মুখর হয়ে ওঠে শ্রীমঙ্গল জেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম।
‘আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শ্রীমঙ্গলে পালিত হয়েছে ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস ২০২৬’। দিনব্যাপী এ আয়োজনে উঠে আসে ভূমির অধিকার, সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশনসহ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নানা দাবি।
রোববার (৯ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে শুরু হয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এর আগে অতিথিরা ফিতা কেটে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন।
দাবির ফেস্টুনে মুখর শহর
উদ্বোধনের পর বিভিন্ন দাবি সংবলিত ফেস্টুন হাতে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করেন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী ও শিশুরা। শোভাযাত্রায় ফুটে ওঠে তাঁদের অধিকার, পরিচয় ও ভূমি রক্ষার নানা দাবি।
শোভাযাত্রাটি ভানুগাছ সড়ক, স্টেশন সড়ক, চৌমুহনী চত্বর, কলেজ রোড ও গুহ রোড প্রদক্ষিণ করে জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে এসে শেষ হয়।
‘নিজের পরিচয় দেওয়ার অধিকার নিজের’
পরে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, পরিচয়ের প্রশ্নে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব মতামত ও আত্মপরিচয়ের অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বক্তারা জাতিসংঘের ২০০৭ সালের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন, আইএলও কনভেনশন-১৬৯ অনুসমর্থন এবং কনভেনশন-১০৭ বাস্তবায়নের দাবি জানান।
তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে, সরকারি নথিতে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বা অন্য কোনো পরিচয়ের পরিবর্তে নিজেদের সাংবিধানিকভাবে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতির দাবি।
বক্তারা বলেন, “একজন মানুষের পরিচয় কয়ভাবে হতে পারে? নিজের পরিচয় দেওয়ার অধিকার তার নিজের। আমরা মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক স্বীকৃতি চাই। আদিবাসীদের সাংবিধানিকভাবে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।”
পৃথক মন্ত্রণালয়, ভূমি কমিশনসহ তিন দাবি
সভাপতির বক্তব্যে আদিবাসী সাংস্কৃতিক কমিটি, বৃহত্তর সিলেট বিভাগের সভাপতি পংকজ এ কন্দ বলেন, মৌলভীবাজার জেলার স্বীকৃত ২৯টি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি স্বীকৃতির দাবিদার অন্যান্য জনগোষ্ঠী ও চা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।
তিনি বলেন, “সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে। সমতলের আদিবাসীদের জন্য আলাদা ভূমি কমিশন করতে হবে। পাশাপাশি আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। আমরা সরকারের কাছে সেটিই প্রত্যাশা করছি।”
আলোচনায় বক্তারা খাসি, গারো, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং চা-বাগানের শ্রমিকদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন। তাঁদের মতে, ভূমি ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এসব জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
সংস্কৃতিতে ফিরে দেখা শিকড়
আলোচনা শেষে ছিল ঐতিহ্যের রঙে ভিন্ন এক আয়োজন। প্রায় ২০টি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক দলের অংশগ্রহণে পরিবেশিত হয় ঐতিহ্যবাহী নৃত্য। নিজ নিজ জাতিসত্তার পোশাক ও নৃত্যের মাধ্যমে শিল্পীরা তুলে ধরেন তাঁদের শেকড়, জীবনযাপন ও সংস্কৃতির গল্প।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য নেরলা তেনসং, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা, ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সাবেক সভাপতি যুবরাজ দেববর্মা, নিরালা পুঞ্জির মান্ত্রী এলভিস পতাম, কথাসাহিত্যিক আকমল হোসেন নিপু, লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মান্ত্রী ফিলা পতমী, বাংলাদেশ আদিবাসী লেখক পরিষদের সভাপতি সনাতন হামোম, শ্রী চুক গারো যুব সংগঠনের সভাপতি পার্থ হাজং ও পাত্রখোলা চা-বাগানের সভাপতি স্বপন কুর্মীসহ অনেকে।
বক্তারা বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান রক্ষায় শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, প্রয়োজন কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন, ভূমির অধিকার ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তাঁরা।
আল ইব্রাহিম
শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার
মোবাইল:০১৬১৭৫০২২৩০

শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি:
প্রকাশের সময়: রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬ । ১১:০৮ অপরাহ্ণ