আলোকিত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে বই পড়ার বিকল্প নেই: প্রাথমিক শিক্ষাস্তরেই প্রয়োজন বই পড়ার অভ্যাস

মান্দা উপজেলা প্রতিনিধি:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬ । ৭:৩৬ অপরাহ্ণ

আখতার জাহান সাথী
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মান্দা, নওগাঁ

“আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা, তোমরা এ যুগে সেই বয়সে লেখাপড়া করো মেলা।
আমরা যখন আকাশের তলে উড়িয়েছি শুধু ঘুড়ি, তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি।
উত্তর মেরু দক্ষিণ মেরু সব তোমাদের জানা, আমরা শুনেছি সেখানে রয়েছে জ্বিন, পরী, দেও, দানা।
পাতালপুরীর অজানা কাহিনী তোমরা শোনাও সবে, মেরুতে মেরুতে জানা পরিচয় কেমন করিয়া হবে।”
কবি সুফিয়া কামালের লেখা “আজকের শিশু” কবিতাটিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্ভাবনার কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে। আমরা সবাই জেনে এসেছি আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রাথমিক পর্যায় হতেই আলোকিত মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে হবে। আলোকিত মানুষ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। এবার আলোচনা করা যাক, আমাদের দেশে বই পড়ার হার কেমন। ২০২৪ সালের International reading habits survey এর তথ্য অনুসারে বিশ্বের ১০২টি দেশের মধ্যে বই পড়ার হারে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭ তম। পরিসংখ্যানটি যদি সত্য হয়ে তবে বিষয়টি মোটেই আশা জাগানিয়া কোন ঘটনা নয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তুলনামূলক আলোচনা করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের শিশুদের বই পড়ার হার ৪৭%, বছরে গড়ে বই পড়ার সংখ্যা ২-৫ টি। ভারতে বই পড়ার হার ৯২%, বছরে গড়ে শিশুরা ৮-১২ টি বই পড়ে। চীনে বই পড়ার হার ৮০%, বছরে গড়ে শিশুরা ১০-১২ টি বই পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে বই পড়ার হার ৭৮%, শিশুরা সেখানে বছরে গড়ে ৮-১০ টি বই পড়ে। আমাদের শিশুরা বই পড়ার দিক হতে অনেক পিছিয়ে আছে। যেসকল দেশের পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে তাঁরা সকলে পৃথিবী রাজত্ব করে চলছে। একটি দেশের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতার ক্রমবিকাশ, সমৃদ্ধির ধাপ জানতে হলে যেমন বই পড়া জরুরী ঠিক তেমনি যুগের সাথে তাল মেলাতে বিশ্বের অন্যান্য দেশ সম্পর্কে ধারণা পেতে, আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে এগিয়ে থাকতেও বই পড়ার বিকল্প নাই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে পরিসংখ্যানের দিকে নজর দেয়া যাক। International reading habits survey এর তথ্য অনুসারে প্রতি বছর বাংলাদেশে ৬২ ঘণ্টা বই পড়ায় ব্যয় করা হয়। সপ্তাহ প্রতি এই সময় দাঁড়ায় ১.২ ঘণ্টা। গড়ে একজন ব্যক্তি বছরে ২.৭৫টি বই পড়লে প্রতি ১০০ জনে বই পড়ে ২৭৫টি এবং প্রতি ১০০০ জনে পড়ে ২৭৫০টি বই। শুধুমাত্র পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে, মাথাপিছু বই পড়ার পরিমাণ বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের প্রায় ০৬ গুণ বেশি। স্পষ্টত যে বই পড়ার পরিমাণ বাড়াতে সবার আগে প্রয়োজন পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা। এই অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য অভিভাবক এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রয়েছে ব্যাপক ভূমিকা। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারে বাবা-মা বা বড়রা নিয়মিত বই পড়েন সেখানে ৪৭.১% শিশু কিশোর নিয়মিত বই পড়ে। যেসব পরিবারে বড়রা বই পড়েন না সেখানে এই হার নেমে আসে ৩১.৮% এ। বর্তমান সময়ে অভিভাবকেরা অনেক ব্যস্ত সময় পার করেন। দাপ্তরিক কাজের বাইরে যতটুকু সময় পান সে সময়টুকু দেন মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এর বাইরে টিভিতে সিরিয়াল কিংবা বিভিন্ন চ্যানেলে ব্রাউজিং তো আছেই। শিশুরা স্বভাবতই বাবা মায়ের কাছে তাঁর নিজের জন্য কিছু সময় এবং প্রশংসা বা অনুপ্রেরণা প্রত্যাশা করে। এমনকি তাঁরা চায় অভিভাবকেরা স্কুলের হোম ওয়ার্কে তাঁদের সাহায্য করুক এবং তাঁরা বিভিন্ন শিল্পকর্ম যেমন তাঁদের আঁকা ছবি, তাঁদের লেখা কোন গল্প কিংবা সৃজনশীল অন্য কিছু বাবা মাকে দেখাতে চায়। কিন্তু অভিভাবকেরা যখন এই সময়টুকু দেন না তখন সন্তানদের মধ্যে আত্মপ্রত্যয় কমে যায়। শিশুদের খাওয়ানোর জন্য বাবা মায়েরা মোবাইল ফোনটিকে গেমসের খেলার জন্য সন্তানের হাতে তুলে দেয় অথবা টিভিতে কার্টুনের চ্যানেল দিয়ে দেন। এসব স্ক্রিনে চলমান বিষয়গুলোর ভাষা অনেক সময় সন্তানের মস্তিষ্কে বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং তাঁদের আচার আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাবা মায়েরা সন্তানের হাতে উপহার হিসেবে বই না দিয়ে রঙিন খেলনা, ভিডিও গেমসের তুলে দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।অথচ এই শিশুদের ঘুমানোর সময় কিংবা খাওয়ানোর সময় অভিভাবকেরা গল্প শুনাতে পারতেন, সারাদিন স্কুলে সন্তানদের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারতেন, বাসার বৈঠক ঘরের এক কোণায় সন্তানকে বই রাখার তাক তৈরি করে দিতে পারতেন। পৃথিবীতে বই পড়ার মত নির্মল আনন্দ আর কিছুতেই নেই—এই বিষয়টি যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ বুঝতে না পারে ততক্ষণ পর্যন্ত বই পড়ার প্রতি আগ্রহ আসে না। একটা সময় ছিল যখন সকল বনেদী পরিবারে পারিবারিক লাইব্রেরি ছিল। জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর বাড়িতেও ছিলো পাঠাগার। এটা মোটামুটি পরিষ্কার যে পরিবারে বই পড়ার অভ্যাস থাকলে শিশুদের মধ্যেও সেই অভ্যাস গড়ে ওঠে। বিদ্যালয় অধ্যায় শুরু করার পর শিশুরা দিনের বেশি ভাগ সময় কাটায় বন্ধু এবং শিক্ষকদের সাথে। প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর জীবন গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই শিশুর মানসিক বিকাশ সাধনে, প্রগতিশীল ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে সকল শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করা খুবই জরুরী। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর রয়েছে এক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা। জাপানের দিকে নজর দেয়া যাক। জাপানের স্কুলগুলোতে ছোটবেলা হতে শিশুদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে “আসা-দোকু” বা “Morning Reading” এবং “কামিশিবাই” বা “সচিত্র বই” নামক চমৎকার নিয়ম অনুসরণ করা হয়। “আসা-দোকু” বা “Morning Reading” এর মাধ্যমে ক্লাস শুরুর আগে ১০-১৫ মিনিট স্কুলের সব শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিজেদের পছন্দের বই নীরবতা ও মনোযোগের সাথে পড়েন। “কামিশিবাই” বা “সচিত্র বই” এর দ্বারা কিন্ডারগার্টেন এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য বড় ছবির কার্ড দেখিয়ে গল্প বলা বা গল্পকে উপস্থাপন করা হয়, যা তাঁদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ করে তোলে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সমৃদ্ধ লাইব্রেরি থাকা প্রয়োজন। এই লাইব্রেরিগুলোতে বয়স ভিত্তিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলাদা তাকে বই সংগ্রহ করতে হবে। যাতে শিশুরা নিজেদের আগ্রহ অনুযায়ী বই নির্বাচন করতে পারে। পঠন বিষয়ক অনুষ্ঠান আয়োজন করা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি ধারণা উল্লেখ করছি। বুক রিভিউ এর মাধ্যমে নিজের পছন্দের বইয়ের বিষয়বস্তু অন্য বন্ধুদের মধ্যে উপস্থাপন করা যেতে পারে, বুক ফেস্ট এর মাধ্যমে বইয়ের প্রদর্শনী করা যেতে পারে, নির্দিষ্ট একটি বই নিয়ে আলোচনার জন্য বুক গ্রুপ স্টাডির ব্যবস্থা করা যেতে পারে, পঠিত বইয়ের উপর কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। সপ্তাহে অন্তত একদিন পাঠাগারে গিয়ে শিশুদের বই পড়ার সুযোগ করে দেয়া যেতে পারে। বই শেয়ারিং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি বই হাত বদল হতে থাকবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাঁরা একত্রে বসে পঠিত সেই বইগুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে পারবে। এর মাধ্যমে শুধু মেধা ও প্রজ্ঞাই বৃদ্ধি পায় না, বরং বই পাঠে শিশু হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল, সহনশীল ও সহমর্মী। বই পাঠে শিশুদের মধ্যে কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং তাঁদের মধ্যে সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটে। যার সুফল শুধু শিশুটির পরিবার নয় বরং সমগ্র দেশ উপভোগ করে।
আজকের শিশুর হাতে যত বেশি বই তুলে দেওয়া যাবে, তত বেশি নিজ দেশের শিল্পসাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং বিজ্ঞান চর্চা ও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে তাঁরা সম্যক ধারণা পাবে এবং পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের সাথে নিজেদের তুলনা করার সুযোগ পাবে। এক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয় রাখতে পারে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা। আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে তৈরি হোক বই পড়ার পরিবেশ। বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারে ছোট আকারে পারিবারিক পাঠাগারের সংস্কৃতি গড়ে উঠুক। পবিত্র কোরআনের প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে “ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক” অর্থাৎ “পাঠ করুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন”। সুতরাং একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশ গঠনে বই পড়ার বিকল্প নেই। আমাদের সকলকে আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে প্রাথমিক শিক্ষা স্তর হতেই সন্তানদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে।

সম্পাদক ও প্রকাশক : শাহ্ বোরহান মেহেদী, নির্বাহী সম্পাদক : গোলাম রাব্বানী অফিস: মেহেদী ভিলা, ঘোড়াশাল, নরসিংদী। ই-মেইল : pannewsbdbm@gmail.com, bmbmmehedi77777@gmail.com মোবাইল: 01715410468, 01865610720.

প্রিন্ট করুন