শেরপুরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক ঘাঘড়া খানবাড়ি জামে মসজিদ

জুবায়ের আহমেদ রাসেল :
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬ । ৫:১৩ অপরাহ্ণ

শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার হাতিবান্ধা ইউনিয়নের ঘাঘড়া লস্কর এলাকায় নিভৃত গ্রামীণ পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে মোগল আমলের স্মৃতি বহনকারী ঐতিহাসিক ঘাঘড়া খানবাড়ি জামে মসজিদ। শত শত বছর ধরে এলাকাবাসীর ধর্মীয় অনুশীলন, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে পরিচিত এই প্রাচীন স্থাপনাটি সময়ের পরিক্রমায় এখনও অতীতের সাক্ষ্য বহন করে চলেছ স্থানীয় সূত্র ও ইতিহাস–ঐতিহ্য অনুসন্ধানকারীদের তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটি বাংলা ১২২৮ সনে নির্মিত হয়, যা ইংরেজি গণনা অনুযায়ী ১৬০৮ সালের কাছাকাছি সময়ের। যদিও এর সঠিক নির্মাণকাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। তবু অধিকাংশের ধারণা মসজিদটির বয়স চার থেকে পাঁচ শতাব্দীর বেশি।

লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, ‘পালানো খাঁ’ ও ‘জব্বার খাঁ’ নামে দুই সহোদর কোনো এক রাজ্যের সেনাপতি ছিলেন। কয়েক শ বছর আগে এক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তারা বাংলার ঝিনাইগাতী এলাকায় এসে আশ্রয় নেন। পরে তারা সেখানে বসতি স্থাপন করে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যা পরবর্তী সময়ে ঘাঘড়া খানবাড়ি জামে মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করে। অন্যদিকে স্থানীয় ইতিহাস অনুসন্ধানকারীদের কেউ কেউ মনে করেন, আজিমোল্লাহ খান নামের এক ব্যক্তি মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মসজিদটির গায়ে থাকা বিভিন্ন কারুকাজ ও নির্মাণশৈলির নিদর্শন বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হয়, এটি মোগল আমলে বক্সার বিদ্রোহী নেতা হিরঙ্গী খানের সময়কালে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে।

স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে মসজিদটি বেশ ব্যতিক্রমধর্মী। এক গম্বুজবিশিষ্ট বর্গাকৃতির এই মসজিদের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় ৩০ ফুট। মসজিদের ভেতরে রয়েছে দুটি সুদৃঢ় খিলান ও একটি মেহরাব। দেয়ালজুড়ে বিভিন্ন রঙের ফুল ও ফুলদানির কারুকাজ শোভা পাচ্ছে, যা প্রাচীন শিল্পকৌশলের একটি অনন্য নিদর্শন।

মসজিদের ওপর একটি বিশাল গম্বুজকে ঘিরে ছোট-বড় মোট ১০ থেকে ১২টি মিনার রয়েছে। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে দুটি জানালা এবং পূর্ব দিকে একটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। প্রায় চার ফুট পুরু দেয়াল চুন ও সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত, যা সেই সময়ের স্থাপত্য কৌশলের দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বের পরিচায়ক।

মসজিদটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এর নির্মাণে ব্যবহৃত ইট। ইটগুলো চারকোনা টালির মতো আকৃতির, যা প্রাচীন স্থাপত্যের একটি বিশেষ ধরণ। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ছয় থেকে সাতশ বছর আগে এ ধরনের ইট ব্যবহারের প্রচলন ছিল। এ ছাড়া মসজিদের আস্তরণে ঝিনুক চূর্ণ বা ঝিনুকের লালার সঙ্গে সুরকি, পাট কিংবা তন্তুজাতীয় আঁশ ব্যবহার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

স্থাপত্যশৈলীতে গ্রিক ও কোরিনথিয়ান রীতির প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়, যা এই মসজিদটিকে অন্যান্য প্রাচীন মসজিদের তুলনায় আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

খানবাড়ির খান বংশের লোকজনের ওয়াকফ করা প্রায় ৫৮ শতাংশ জমির ওপর মসজিদটি অবস্থিত। এর মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশ জায়গাজুড়ে রয়েছে মূল ভবন ও বারান্দা এবং বাকি ৪১ শতাংশ জায়গা জুড়ে রয়েছে কবরস্থান। মসজিদের পাশেই রয়েছে দুটি পুকুর, যার আয় দিয়ে মসজিদের বিভিন্ন ব্যয় নির্বাহ করা হয়।

মসজিদের ভেতরে ইমামসহ তিন কাতারে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। এছাড়া মসজিদের বারান্দা ও খোলা জায়গায় আরও প্রায় ১০০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। সব মিলিয়ে প্রায় দেড়শ মুসল্লির একসঙ্গে নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

একসময় মসজিদের দরজায় কষ্টিপাথরে খোদাই করা আরবি ভাষায় এর নির্মাণকাল উল্লেখ ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে সেই কষ্টিপাথরটি চুরি হয়ে যায়। ফলে ঐতিহাসিক এই নিদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হারিয়ে গেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৯৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয় এবং এটিকে তালিকাভুক্ত একটি পুরাকীর্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ খুব একটা দৃশ্যমান নয়।

সম্প্রতি দেখা গেছে, শেরপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে সবুজে ঘেরা ঘাঘড়া গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি। কয়েরুট সড়ক থেকে পশ্চিমে প্রায় দুই কিলোমিটার মেঠোপথ পাড়ি দিলেই সবুজ ঘাসে ঘেরা মাঠের মাঝে চোখে পড়ে মোগল আমলের এই স্থাপনাটি। বর্তমানে মসজিদের ভেতর সাদা রং করা থাকায় আগের রঙিন কারুকাজ তেমন স্পষ্ট দেখা যায় না।

এলাকার স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, ধারণা করা হয় মসজিদটি ১৬০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। মোগল আমলে বক্সার বিদ্রোহী নেতা হিরঙ্গী খানের সময় এটি নির্মিত হয়েছে বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। তিনি বলেন, মসজিদটি এতটাই দৃষ্টিনন্দন যে প্রতিদিন এখানে দর্শনার্থীরা আসেন এবং অনেকে নামাজ আদায়ও করেন। তবে দীর্ঘদিন পুরোনো হলেও সংরক্ষণ ও সংস্কারে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি জেলার পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. ফেরদৌস খান বলেন, প্রায় ৫০০ বছর আগে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। বংশপরম্পরায় দাদার পর বাবা এবং বর্তমানে তিনি এর দায়িত্ব পালন করছেন। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় হয় এবং ইমাম ও মুয়াজ্জিন রয়েছেন। তিনি জানান, মসজিদের নামে দুটি পুকুর রয়েছে এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে বিভিন্ন খরচ বহন করা হয়।

তিনি আরও বলেন, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ মোগল আমলের এই মসজিদটি একনজর দেখতে আসেন। আগে মসজিদের ভেতরের কারুকাজে বিভিন্ন রঙ ছিল, কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সাদা রং করে দেওয়ায় আগের সৌন্দর্য আর তেমন দেখা যায় না।

স্থানীয়দের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলে ঝিনাইগাতীর এই ঐতিহাসিক মসজিদটি শুধু ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবেই নয়, বরং জেলার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য ও সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও নতুনভাবে পরিচিতি পেতে পারে।

সম্পাদক ও প্রকাশক : শাহ্ বোরহান মেহেদী, নির্বাহী সম্পাদক : গোলাম রাব্বানী অফিস: মেহেদী ভিলা, ঘোড়াশাল, নরসিংদী। ই-মেইল : pannewsbdbm@gmail.com, bmbmmehedi77777@gmail.com মোবাইল: 01715410468, 01865610720.

প্রিন্ট করুন