শুক্রবার | ২২শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

দৈনিক পাবলিক বাংলা বিশ্বজুড়ে বাঙলার মুখপত্র
বিশ্বজুড়ে বাঙলার মুখপত্র

দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে ১৬৭ তম প্রতিষ্ঠা দিবস…!!

উজ্জ্বল রায়, জেলা প্রতিনিধি নড়াইল থেকে:

দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে ১৬৭ তম প্রতিষ্ঠা দিবস…!!

শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রার দিন পূর্ণিমার এই পূন্য তিথিতে ভবতারিণী মায়ের এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। সন তারিখ হিসেবে দিনটি ছিল ১৮৫৫ সালের ৩১মে জৈষ্ঠ্য মাসের ১৮ তারিখ ! কিন্তু তিথি হিসেবে এই স্নানযাত্রার দিনটিকেই মন্দির প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
ফিরে দেখা সেদিনের ইতিহাস – খবরটা চারদিন আগেকার। আর সেটাকেই ফলাও করে ছেপেছে ‘সংবাদ প্রভাকর’। ঈশ্বর গুপ্তের কাগজ। ২২ জ্যৈষ্ঠ ১২৬২ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ৪ জুন ১৮৫৫-র কাগজে ছাপা হয়েছিল দক্ষিণেশ্বরে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠার সংবাদ—‘‌জানবাজার নিবাসিনী পুণ্যশীলা শ্রীমতী রানী রাসমণি জ্যৈষ্ঠ পৌর্ণমাসী তিথি যোগে দক্ষিণেশ্বরের বিচিত্র নবরত্ন ও মন্দিরাদিতে দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। ওই দিবস তথায় প্রায় লক্ষ লোকের সমাগম হইয়াছিল।’‌ মন্দির প্রতিষ্ঠাত্রী রানি রাসমণি ছিলেন সর্ব অর্থেই ব্যতিক্রমী, সমসাময়িক রক্ষণশীলতার মুখে ছুঁড়ে দেওয়া নিত্য চ্যালেঞ্জ। তা ছাড়া একের পর এক বাধায় মন্দির প্রতিষ্ঠার তারিখ ক্রমশ পিছোচ্ছিল ! মন্দির তৈরি হওয়ার আগেই মূর্তি তৈরির বরাত দিয়ে বসেছিলেন দাঁইহাটের বিখ্যাত শিল্পী নবীন ভাস্কর কে । মূর্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কালো ধূসর আগ্নেয়শিলা ব্যাসল্ট পাথর দিয়ে তৈরি কালী। চতুর্ভুজা দেবীমূর্তির উচ্চতা তিন ফুটেরও কম, সাড়ে তেত্রিশ ইঞ্চি। প্রচলিত কালীমূর্তির মতোই দেবীর গলায় মুণ্ডমালা। কিন্তু কোমরে কাটা হাত গেঁথে তৈরি কটিবন্ধনী নেই। দেবী শায়িত শিবের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। শিবের মূর্তিটি সাদা মার্বেল পাথরের। মূর্তি তৈরি শেষ হওয়ার পর সেটাকে একটা কাঠের বাক্সে সযত্নে ভরে রাখা হয়। পাছে কোনওভাবে মূর্তিটি ভেঙে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেজন্যই এই ব্যবস্থা। সেই মূর্তি বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে আছে অনেকদিন। আর দেরি করার পক্ষপাতী ছিলেন না জানবাজারের রানি। মন্দির প্রতিষ্ঠা হবে, আর দেরি করা চলবে না। এই হল তাঁর মত। সাত বছর আগে ১৮৪৮-এ প্রথম মন্দির নির্মাণের ভাবনাটা মাথায় আসে। নৌকাযোগে কাশী যাওয়ার পথে স্বপ্নাদেশ লাভ। কাশী যাওয়ার আর দরকার নেই। ভাগীরথী তীরেই দেবীকে প্রতিষ্ঠা করে অন্নভোগ নিবেদনের আদেশপ্রাপ্তি। স্বপ্নে আদেশ পাওয়া মাত্র কোমর বেঁধে কাজে নেমে পড়েন রানি। আর পড়ামাত্র একটার পর একটা বাধার মুখোমুখি। প্রথম বাধা জমি নিয়ে। গঙ্গার পশ্চিমকূল, বারানসী সমতুল। স্বাভাবিকভাবে প্রথম খোঁজ চলল সেখানে। অর্থাৎ বালি-উত্তরপাড়ায়। রানি ধর্মপ্রাণা এবং বিত্তশালী। সুতরাং মন্দিরের জমির জন্য যে-কোনও অঙ্কের অর্থ দিতে তৈরি ছিলেন। তবু জমি পাওয়া গেল না। কারণটা কী ছিল তা স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ জানিয়েছিলেন ‘লীলাপ্রসঙ্গ’-এর রচয়িতা স্বামী সারদানন্দকে। বালি-উত্তরপাড়ার জমিদারদের বক্তব্য ছিল, ‘‌তাঁহাদের অধিকৃত স্থানের কোথাও অপরের ব্যয়ে নির্মিত ঘাট দিয়া তাঁহারা গঙ্গায় অবতরণ করিবেন না।’‌ এই জমিদারদের নেতৃত্বে ছিলেন নড়াইলের জমিদার রতন রায় আর সাতক্ষীরার জমিদার প্রাণনাথ চৌধুরি। শোনা যায় রতন রাসমণির প্রিয় জামাই মথুরা মোহন বিশ্বাসকে বলে পাঠিয়েছিলেন, স্ত্রীলোকের এত বাড়াবাড়ি ভাল নয়। এই রতন মহা ঘটা করে বরানগরের কুঠিঘাটে দশমহাবিদ্যার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ভাগনে হৃদয়কে নিয়ে সেই মন্দির দর্শন করতে যান শ্রীরামকৃষ্ণ। ততদিনে রামরতনের মৃত্যু হয়েছে। মন্দিরের বেহাল দশা। নিত্য সেবাটুকুও প্রায় অনিয়মিত। কষ্ট পেলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। রানির জামাই মথুরামোহনকে জানালেন সেকথা। শুনলেন রানিও। ঠিক করলেন প্রতি মাসে দশ মহাবিদ্যা মন্দিরে দুমণ চাল আর দুটাকা পাঠাবেন। নিয়মিত ভোগের ব্যবস্থা করবেন। যে ব্যক্তি একদিন তাঁর মন্দির প্রতিষ্ঠায় বাধ সেধেছিল, তাঁরই প্রতিষ্ঠা করা মন্দিরের দেখভালের দায়িত্ব নিতে হল রাসমণিকেই। ন্যায়ের অদ্ভুত গতিপথ। অগত্যা জমির খোঁজ শুরু হল পূর্বপাড়ে। প্রথমে ভাটপাড়ায়। সেখানে বলরাম সরকার জমি দিতে রাজি হলেন। কথাবার্তা পাকা। কিন্তু শেষমুহূর্তে ভাটপাড়ার গোঁড়া ব্রাহ্মণদের চাপে বেঁকে বসলেন। এক বিধবা মন্দির তৈরি করবে, এটা মেনে নিতে পারেনি গোঁড়া হিন্দুসমাজ। শেষমেশ জমি কেনা হল দক্ষিণেশ্বর গ্রামে। প্রাচীনকালে এই জায়গাটার নাম ছিল শোণিতপুর। বানরাজার রাজত্বের মধ্যে ছিল ওই গ্রাম। বানরাজাই নাকি সেখানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শিবলিঙ্গ। সেই শিবলিঙ্গের নাম অনুসারে জায়গাটার নাম দক্ষিণেশ্বর। সেখানেই পাওয়া গেল জমি। একলপ্তে ষাট বিঘা। জমির মালিক কোনও হিন্দু জমিদার নন। তিনি খ্রিস্টান। নাম হেস্টি। কলকাতায় তখন সুপ্রিম কোর্ট। সেখানকার অ্যাটর্নি তিনি। জমি কিনতে খরচ হল ৫৫ হাজার টাকা। জমির গড়ন খানিকটা কচ্ছপের পিঠের মতো, অর্থাৎ তন্ত্রমতে শাক্তসাধনার উপযুক্ত এই জমি। জমি কেনার বাধা কাটানোর পর মন্দির নির্মাণে বাধা। মন্দির কেমন হবে সে সম্পর্কে রানির ধারণা ছিল স্পষ্ট। মন্দির হবে নবরত্ন মন্দির। অর্থাৎ মন্দিরের মাথায় থাকবে নয়টি চূড়া। প্রথম ধাপে চারটে। তার ওপরের ধাপে আরও চারটে। আর একবারে মন্দিরশীর্ষে একটা। রাসমণি মন্দিরের এই গঠনশৈলীর ধারণা পেয়েছিলেন সম্ভবত একটি রাধাকৃষ্ণর মন্দির দেখে। মণ্ডলদের রাসমন্দির। টালিগঞ্জের কাছে। মণ্ডল পরিবারের আদিনিবাস ছিল বজবজের কাছে বাওয়ালিতে। সেখানেই তাঁদের জমিদারি প্রায় আড়াইশোটা গ্রামজুড়ে। পরিবারের তিন পুরুষ সদস্য, তিন ভাই, কলকাতায় টালি নালার কাছে থাকতে শুরু করেন। ইংরেজদের সঙ্গে তাঁদের দারুণ দহরম-মহরম। সেই সখ্যকে আরও পোক্ত করতেই সম্ভবত তাঁদের কলকাতায় বাস করার সিদ্ধান্ত। ওই তিন ভাইয়ের একজন প্যারীলাল মণ্ডল। স্নান করতে গিয়েছিলেন আদিগঙ্গায়। সেখানেই জলের তলায় পান রাধাকৃষ্ণের মূর্তি। জল থেকে তুলে এনে সেই মূর্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জমিদারির দশ বিঘা জমির ওপর তৈরি হয় মন্দির। সেই মন্দিরের স্থাপত্যে ছিল ওই নবরত্ন শৈলী। মন্দিরের মাথায় তিন ধাপে নয়টি চূড়া। প্যারীলালরা রাধাকৃষ্ণ মন্দির চত্বরেই নির্মাণ করেছিলেন শিবমন্দির। নয়টি। মন্দির তৈরি হয়েছিল ১৮৪৭ সালে। দক্ষিণেশ্বর মন্দির নির্মাণের আট বছর আগে। জানবাজারের রাজবাড়ির মেয়ে, রাসমণির প্রপৌত্রী, নগেন্দ্রবালার বিয়ে হয় মণ্ডল পরিবারে।

আপনার মতামত দিন

Posted ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৬ জুন ২০২১

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
ড. সৈয়দ রনো   উপদেষ্টা সম্পাদক   
শাহ্ বোরহান মেহেদী, সম্পাদক ও প্রকাশক
,
ঢাক অফিস :

২২, ইন্দারা রোড (তৃতীয় তলা), ফার্মগেট, তেজগাও, ঢাকা-১২১৫।

নরসিংদী অফিস : পাইকসা মেহেদী ভিলা, ঘোড়াশাল, নরসিংদী। ফোনঃ +8801865610720

ই-মেইল: news@doinikpublicbangla.com